কার্বুরেটর নাকি ফুয়েল ইঞ্জেকশন—কোনটি বেশি ভালো?

769

সময়ের প্রয়োজনে মোটরসাইকেলেও  আধুনিক সুবিধা যুক্ত হচ্ছে। কিক স্টার্টের পাশাপাশি ইলেক্ট্রিক স্টার্ট, টিউব টায়ারের পরে টিউবলেস টায়ার এবং এরকম আরো অনেক কিছু। সময়ের প্রয়োজনে এবং অধিক সুবিধার জন্যই নতুনের আগমন। নতুন প্রযুক্তির আগমনে কখনও মনে হয় পুরাতনটিই ভালো ছিলো, কিন্তু নতুনে অভ্যস্থ হবার পরে বোঝা যায় নতুনটির সুবিধা কত।

যদিও শুরুতে হয়তো কিছু খরচ বেশি হয়ে থাকে, কিন্তু আস্তে আস্তে বিষয়টি সহনীয় হয়ে আসে, দাম এবং অভ্যাস উভয়দিকেই।

বর্তমানে দুই ধরনের মোটর বাইক ইঞ্জিন বেশি দেখা যায় , প্রথমত কার্বুরেটর ইঞ্জিন, দ্বিতীয়ত ফুয়েল ইঞ্জেকশন। এই দুই ধরনের ইঞ্জিন এর কাজ ও ভাল মন্দ নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত ধারনা দেবার প্রয়াস থাকবে আমাদের ।

কার্বুরেটর  ইঞ্জিনের কাজ  

এয়ার ইনটেক বা এয়ার ফিল্টারের মাঝ দিয়ে কার্বুরেটরের ভিতর বায়ু প্রবেশ করে। আর কার্বুরেটরের ভিতর দিকের দেয়াল ক্রমশ সরু হয়ে যাওয়ায় এর ভিতরে বায়ুর চাপের কারণে গতিও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। থ্রটল স্লাইডের—থ্রটল ক্যাবলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত একটি ভাল্ব—সঙ্গে আড়াআড়ি দিকে বায়ু প্রবাহিত হয়। থ্রটল টানলে এটা খুলে যায়, ক্যাবলটি কার্বুরেটরের বডিতে বসানো থ্রটল স্লাইডকে সারিয়ে দেয়। স্লাইড সরে গেলে দ্রুত গতির বাতাস ফ্লোট চেম্বার থেকে মেইন জেটে জ্বালানি টেনে নেয়।

এটা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই হয়, কারণ উচ্চ চাপের (ফ্লোট চেম্বার) জায়গা থেকে জ্বালানি সহজেই নিম্ন চাপের (কার্বুরেটর বডি) এলাকায় প্রবাহিত হয়। সেখানে জ্বালানি বায়ুর সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে ইঞ্জিনের ভিতর প্রবেশ করে। আর এক্ষেত্রে কতোখানি জ্বালানি প্রবাহিত হবে তা নির্ভর করে নিডল ভাল্বের অবস্থান ও আকার, মেইন জেটের আকার এবং ফ্লোট চেম্বারে জ্বালানি তেলের উচ্চতা তথা চাপের ওপর।

কার্বুরেটর ইঞ্জিনের সুবিধা 

  • এটি অপারেট করা খুব সহজ।
  • ফুয়েল ইঞ্জেকশন সিস্টেম এর তুলনাই দাম কম, তাই পরিবর্তন করাও সহজ।
  • দ্রুত সার্ভিসিং করা যায় এবং সহজ লভ্য।
  • টিউনিং এবং সেটিং করা সহজ।
  • ইঞ্জিন বিরক্ত ছাড়া পৃথকভাবে খোলা যায়।

কার্বুরেটর ইঞ্জিনের অসুবিধা 

  • কার্বুরেটর ইঞ্জিনের ফ্লোট চেম্বারে জ্বালানির উচ্চতা ফ্লোট দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তাই কার্বুরেটরের ভিতরে সঠিকভাবে ফ্লোটগুলো অ্যাডজাস্ট করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
  • কার্বুরেটর ইঞ্জিনের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিনের ভিতরে ব্যবহৃত ভ্যাকুয়াম লাইনে এয়ার লিক দেখা দিতে পারে। এসব লিকের কারণে ইনটেকের ভিতর অধিক হারে বায়ু ঢুকতে পারে। এর ফলে বায়ু-জ্বালানির মিশ্রণের ভারসাম্য নষ্ট হয়।
  • কার্বুরেটর ইঞ্জিনের ইনটেক সিস্টেম অধিক বায়ু ও কম জ্বালানি মিশ্রণ ব্যবহার করলে অন্তর্দহন প্রকোষ্ঠের তাপমাত্রা প্রচুর পরিমাণে বৃদ্ধি পায়।

ফুয়েল ইনজেকশন সিস্টেম

১৯৮০ সালের দিকে সর্বপ্রথম মোটরসাইকেলে ইলেক্ট্রনিক্স FI সিস্টেম ব্যবহার হওয়া শুরু হয়। এটি মোটরসাইকেল জগতে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন বলা যেতে পারে। ইলেক্ট্রনিক্স প্রসেসর নিয়ন্ত্রিত সিস্টেমটি জ্বালানির সর্বোচ্চ ব্যবহার সুনিশ্চিত করে।

ফুয়েল ইনজেকশন সিস্টেমটি মুলত কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত একটি অংশ যা মোটরসাইকেলের অবস্থান, গতি, তাপমাত্রা ইত্যাদির অবস্থা বিবেচনা করে ইনজিনে প্রয়োজনীয় সঠিক মাপের শক্তি যোগানের স্বার্থে ইনজিনে জ্বালানি তেলের প্রবাহ নিশ্চিতা করা। এই সিস্টেমে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি ব্রেইন বা প্রসেসর ব্যবহার করা হয় যাকে ECU (Electronic Control Unit) বলে। যার সংগে যুক্ত থাকে একাধিক সেন্সর। যারা মোটরসাইকেলের বিভিন্ন অংশের অবস্থানগত তথ্য ECU এর কাছে পাঠায়। ECU সেন্সরগুলোর পাঠানো তথ্য বিচার করে সেই মোতাবেক সিদ্ধান্ত গ্রহন করে ইনজিনে কি পরিমান জ্বালানির জোগান প্রয়োজন, এবং সেই পরিমান জ্বালানি দিতে Fuel Injector কে নির্দেশ প্রদান করে।

কার, ট্রাক ও অন্যান্য আধুনিক যানবাহনের ইঞ্জিনের মতো বাইকের ইঞ্জিনের ফুয়েল ইঞ্জেকশনও একইভাবে কাজ করে। ইঞ্জিন কন্ট্রোল ইউনিট বা ইসিইউ হিসেবে পরিচিত একটি ক্ষুদ্র কম্পিউটার বৈদ্যুতিক পদ্ধতিতে ইঞ্জিনের ফুয়েল ইঞ্জেকশন নিয়ন্ত্রণ করে। কম ধোঁয়া উৎপাদন, শক্তির অপচয় কমানো ও অধিক অ্যাক্সিলারেশন নিশ্চিত করতে ইঞ্জিনে কতোখানি ফুয়েল ইঞ্জেক্টর থেকে প্রবেশ করবে সেটা থ্রটল, আরপিএম, বায়ু ও ইঞ্জিনের তাপমাত্রা এবং ক্র্যাঙ্কশ্যাফটের অবস্থান প্রভৃতি ভ্যারিয়েবলের ভিত্তিতে ইসিইউ নির্ধারণ করে।

আধুনিক বাইকগুলোতে ফুয়েল ইঞ্জেক্টরগুলো সেকেন্ডে একাধিক বার খুলতে ও বন্ধ হতে পারে। একভাবে বললে বৈদ্যুতিক  চিরাচরিত কার্বুরেটরের চেয়ে অনেক সহজ পদ্ধতিতে কাজ করে। সংক্ষেপে বললে, ইএফআই হচ্ছে একটি নজল যেটা কম্পিউটারের নির্দেশ মতো ইঞ্জিন প্রকোষ্ঠে প্রয়োজন অনুসারে বায়ুতে ফুয়েল স্প্রে করে।

ফুয়েল ইনজেকশন এর সুবিধা

  • এর সবথেকে বড় সুবিধা হল  জ্বালানি তেলের সর্বোচ্চ ব্যবহার।
  • সব সময় একইপরিমান শক্তির যোগান দেয়।
  • এটি সরাসরি স্টার্টার মোটর থেকে শক্তি নেই তায় ঠান্ডায় সহজেই স্টার্ট হয়
  • নিখুত থ্রটল রেসপন্স দেয়
  • তুলনামুলক বেশি মাইলেজ দেয়
  •  রাইডিং মোড অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ করে বিধায় জ্বালানি খরচ কম

ফুয়েল ইনজেকশন এর অসুবিধা

  • মেইনটেনেন্স খরচ বেশি
  • বাইকের দাম বেশি
  • জ্বালানি তেলের সর্বশেষবিন্দু পর্যন্ত ব্যবহারের সুযোগ নেই

কার্বুরেটর নাকি ফুয়েল ইঞ্জেকশন—কোনটি বেশি ভালো?

এখন আসা যাক মুল প্রশ্নে কার্বুরেটর নাকি ফুয়েল ইঞ্জেকশন—কোনটি বেশি ভালো?

আমার মতে ফুয়েল ইঞ্জেকশন সিস্টেম ভাল, কারন

ফুয়েল ইঞ্জেকশন ইঞ্জিনগুলো বেশি টেকসই হয়, কারণ এতে ইএফআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, যা নির্ভুলভাবে বায়ু-জ্বালানির অনুপাত নির্ধারণ করতে পারে। ফলে ইঞ্জিনে কখনো অত্যধিক বেশি বা খুব কম তাপমাত্রা তৈরি হওয়ার সুযোগ পায় না। এর কারণেই মূলত স্পার্ক প্লাগগুলো বেশিদিন টিকে, ভাল্বগুলো পুড়ে না এবং পিস্টন রিংগুলো দ্রুত ঝেরঝেরে হয় না। যার ফলে ইঞ্জিন দীর্ঘস্থায়ী হয়।

 

তথ্য সুত্রঃ bikesmedia.in , motorcyclenews.com , motor.onehowto.com , bikeadvice.in , motornet.cn , ultimatemotorcycling.com

আপনার কোন প্রস্ন থাকলে বা এই বিষয়ে কোন কিছু জানানোর থাকলে নীচের মন্তব্য বিভাগে লিখতে ভুলবেন না । আপনার রাইডার বন্ধুদের সাথে নিবন্ধটি শেয়ার করে নিন যাতে তারাও জানতে পারে ।

-BikeGuy Advertisement-